Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

‘এটি মানুষকে পশু বানিয়ে ফেলে’

বাংলাদেশে ইয়াবা মহামারির ভয়াল চিত্র

দ্য আইরিশ টাইমস :   |   বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশে ইয়াবা মহামারির ভয়াল চিত্র

ছবি : সংগৃহীত

‘মেটালফ্রিক’ একসময় প্রতিদিন তাঁর পোষা পাখির সঙ্গে সময় কাটাতেন। তিনি পাখির গায়ে হাত বুলিয়ে দিতেন, তার খাঁচা পরিষ্কার করতেন এবং তাকে ওড়ার জন্য ছেড়ে দিতেন। ‘এখন আর আমি এসব করতে পারি না। কে এসবের পরোয়া করে?’ ঢাকায় নিজের অগোছালো শোবার ঘরে শুয়ে কথাগুলো বলছিলেন তিনি।

চল্লিশের কোঠার এই ব্যক্তি তাঁর দেওয়া ছদ্মনাম ব্যবহার করতে বলেন। তিনি ইয়াবার মারাত্মক আসক্তিতে ভুগছেন। মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি এই মাদক বাংলাদেশে অগণিত জীবন ধ্বংস করছে। ‘এই জিনিসটা আমার মনমানসিকতা একেবারে শেষ করে দিয়েছে’, বলেন তিনি।

থাই ভাষায় ‘ইয়াবা’ শব্দের অর্থ ‘পাগল করা ওষুধ’। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষ এই মাদকে আসক্ত এবং এই সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

মেটালফ্রিক বলেন, ইয়াবার প্রভাব চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা থাকে। ইয়াবা সেবন করলে টানা তিন দিন জেগে থাকার পর চরম ক্লান্তি নিয়ে তিনি একসঙ্গে ১২ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ঘুমান।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, দেশের সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের প্রায় ৫ শতাংশ মাদকে আসক্ত। আর ‘নতুন সিন্থেটিক ও আধা সিনথেটিক মাদকের বিস্তার’ এই সমস্যাকে আরও তীব্র করছে। চলতি মাসে বাংলাদেশের সংসদে মাদকসংক্রান্ত কিছু অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে একটি বিল অনুমোদন করা হয়েছে।

বাংলাদেশে ইয়াবাকে ‘ক-শ্রেণির’ নিষিদ্ধ মাদক হিসেবে গণ্য করা হয়। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে ২০১৮ সালে কর্তৃপক্ষ মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করেছিল। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের নিষ্ঠুর ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধের’ মতো সেই অভিযানে কয়েক মাসের মধ্যে ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়।

এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, ২০১৮ সালে ৪৬৬ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল। সংস্থাটি বলেছে, মাদকবিরোধী অভিযান হিসেবে যা চালানো হয়েছিল, তা ‘দেশের সবচেয়ে দরিদ্র কিছু এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। সেখানে মানুষের মনে এই ভয় ঢুকে যায় যে মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার সামান্য সন্দেহের বশেই তাদের প্রিয়জনরা হয়তো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে পারে।’ এ ছাড়া আরও কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তা সত্ত্বেও ইয়াবার ব্যবহার বেড়েই চলেছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ‘আমরা যদি মাদকের ব্যবহার কমাতে চাই, তাহলে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি করতে হবে।’ ঢাকার নিরাময় পুনর্বাসন কেন্দ্রেও কাজ করেন আরিফুজ্জামান। ওই কেন্দ্রের অভ্যর্থনা কক্ষের পেছনের দেয়ালে লেখা আছে, ‘যেখানে নিরাময় শুরু, সেখান থেকেই জীবন।’

চিকিৎসক আরিফুজ্জামান বলেন, সারা দেশে মাত্র ৩৫০ জনের মতো মনোরোগ–বিশেষজ্ঞ আছেন। জাতীয় ইনস্টিটিউটে মনোরোগ–বিশেষজ্ঞরা হয়তো এক ঘণ্টায় হয়তো ২০ জন রোগী দেখতে পারেন, ‘কিন্তু আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশে মানসম্পন্ন মনোবিজ্ঞানীরও একই রকম অভাব রয়েছে। তিনি চান, সরকার যেন মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করে।

২০১৮-১৯ সালে পরিচালিত বাংলাদেশের সর্বশেষ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা গেছে, যাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন, তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ কোনো চিকিৎসা নেন না। আরিফুজ্জামান বলেন, ‘সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে।’ তবে গত কয়েক বছরে এ বিষয়ে সচেতনতা ‘অভূতপূর্ব মাত্রায়’ বেড়েছে।

আরিফুজ্জামান বলেন, ইয়াবায় আসক্তি এখন ‘খুবই সাধারণ’ বিষয়। তবে অনেক ব্যবহারকারী অন্যান্য মাদকও গ্রহণ করে। এর মধ্যে বুপ্রেনোরফিন ইনজেকশন, হেরোইন ও ওমোরফোন বড়ি থাকতে পারে। প্রায় প্রতিটি মাদকের ব্যবহারই বাড়ছে। তবে ইয়াবার ব্যবহার ‘উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে’।

আরিফুজ্জামান বলেন, কিছু ব্যবহারকারী মাদক নেওয়ার পরও ‘কর্মক্ষম’ থাকেন। তবে অন্যদের ‘মস্তিষ্কের দুর্বলতার’ কারণে তাঁরা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। বন্যা, অগ্নিকাণ্ড ও কোভিড-১৯ মহামারি সংকটের মতো বাহ্যিক ঘটনাগুলো এই পরিস্থিতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

আরিফুজ্জামান বলেন, আসক্ত কিছু ব্যক্তি মাদকের খরচ জোগানোর অন্য কোনো উপায় না পেয়ে নিজেরাই কারবারি (ডিলার) হয়ে যান। আবার অনেকে বিষণ্নতা, উদ্বেগজনিত মানসিক ব্যাধি কিংবা মানসিক ভারসাম্যহীনতার (সাইকোসিস) মতো সমস্যায় ভুগছিলেন, যা থেকে মুক্তি পেতে তাঁরা মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

আরিফুজ্জামান আরও বলেন, কোনো মাদক সহজে পাওয়া গেলে সেটাই বেশি সংখ্যক মানুষ সেবন করে। মাদক ও অপরাধবিষয়ক জাতিসংঘের দপ্তরের (ইউএনওডিসি) তথ্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ইয়াবা সেবন ‘তরুণদের সংস্কৃতির’ অংশ হয়ে ওঠার আগে এশিয়ার কিছু অংশে এটা ট্রাকচালকদের মতো পেশাজীবীরা সেবন করতেন। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ১২ লাখ ইয়াবা বড়ি জব্দ করা হয়েছিল বলে ইউএনওডিসি জানিয়েছে।

থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও লাওসের সীমান্ত যেখানে মিলেছে, তা ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ নামে পরিচিত। ধারণা করা হয়, এটি সিন্থেটিক মাদক উৎপাদনের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে সক্রিয় এলাকাগুলোর একটি। ইউএনওডিসি বলছে, ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড ২৩৬ টন মেথামফেটামিন (সাধারণত মেথ নামে পরিচিত) জব্দ করা হয়েছে। এটি ২০২৩ সালের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। তবে সম্ভবত আরও অনেক বেশি মাদক বাজারে বিক্রির জন্য চলে যাচ্ছে। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে আসা ইয়াবার প্রধান উৎপাদনকারী দেশ হলো মিয়ানমার।

‘সবারই কষ্টের গল্পগুলো প্রায় একই রকম’, বলেন মেটালফ্রিক। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যাঁরা ইয়াবায় আসক্ত হন, তাঁরা সাধারণত শুরুটা করেন সিগারেট দিয়ে, তারপর গাঁজা এবং এরপর কফ সিরাপ সেবন করেন। তরুণ বয়সে তিনি গাঁজার মতো ‘মানসিক অবসাদ সৃষ্টিকারী’ মাদকের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। প্রথমবার ইয়াবা সেবনের সময় তিনি ভেবেছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে ‘আড্ডা বা মাস্তি’ করতে ভালো লাগবে; কিন্তু এটি ‘আমার মনকে চরম উত্তেজিত করে তোলে… এই জিনিসটা মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়।’

ইয়াবা আগে আরও ব্যয়বহুল ছিল। তবে এখন দুই ধরনের ইয়াবা পাওয়া যায়: সস্তা ও দামি। তিনি বলেন, সস্তা ইয়াবা মুখ ও দাঁতের ‘পুরোপুরি বারোটা বাজিয়ে দেয়’। অন্যদিকে ‘(একজন ব্যবহারকারীর) চোখের দিকে তাকালেই আপনি বুঝতে পারবেন যে তাঁরা পাগল হয়ে গেছে।’

মেটালফ্রিক বলেন, এই বড়ির কারণে তিনি অনেক বন্ধুকে হারিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি নিয়মিত সেবন করলে স্ট্রোক হতে পারে। অনেকে দাঁত হারায় বা তাদের ‘খিঁচুনি’ হতে শুরু করে।

মেটালফ্রিক বলেন, গত কয়েক বছরে আফিম বা হেরোইন পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। ইয়াবা অন্য সব মাদককে পুরোপুরি হটিয়ে দিয়েছে। ঢাকায় রাস্তায় তরুণদের সহজেই এই বড়ির প্যাকেট বিক্রি করতে দেখা যায়। মোহাম্মদপুর নামের এলাকায় দেখা যায়, অল্প বয়সী ছেলেরা বড়ির ছোট প্যাকেট উঁচু করে ধরে আছে; আর রিকশাচালকেরা হাত বাড়িয়ে সেটি নিয়ে নিচ্ছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়, যার জেরে শেখ হাসিনার পতন ঘটে। পরে ২০২৬ সালের নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়লাভ করে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। বিভিন্ন বৈশ্বিক সূচকেও এ কথা বলা হয়েছে। দেশের বহু তরুণ তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছেন।

এসব উত্থান–পতন ব্যক্তিগত জীবনেও জটিলতা তৈরি করে।

মেটালফ্রিক জানান, সম্প্রতি মারা যাওয়া তাঁর বাবাকে আগে সবাই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশংসা করলেও সম্প্রতি বন্ধুরা তাঁকে ‘ভুয়া’ বলে। মেটালফ্রিক একটি ব্যবসা চালাতেন; কিন্তু আগুন লেগে তাঁর প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি পুড়ে যায়। এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড বিস্ময়করভাবে বাংলাদেশে নিয়মিত ঘটে। তাঁর সন্দেহ, ঘটনাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল; যদিও অন্যদের মতে এটি বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা হতে পারে।

এখন তিনি বাইরের জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকেন ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে। সেখানে তিনি গাঁজা নিয়ে বহু ভিডিও দেখেন। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে বাদামি বর্ণের মানুষ এবং বিশেষ করে মুসলমানদের মূল্যহীন হিসেবে দেখা হয়। পশ্চিমা গণমাধ্যম এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে তিনি নিজের হতাশার কথাও জানান।

মেটালফ্রিক বলেন, ইয়াবা মানুষকে ‘মিথ্যা আত্মবিশ্বাস’ দেয়। এতে অনেকে ‘অদ্ভুত সব ষড়যন্ত্র তত্ত্বে’ বিশ্বাস করতে শুরু করে। তার কথাবার্তা এলোমেলো হয়ে যায়। কথা বলতে বলতেই তিনি কিম জং-উন, চীনের উইঘুর, নি-ক্যাপ, ভেনেজুয়েলা, অং সান সু চি এবং ভ্লাদিমির পুতিনকে নিয়ে নিজের ভাবনার কথা বলতে শুরু করেন।

মেটালফ্রিক বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সব কিছুকেই প্রভাবিত করে—সন্ত্রাসবাদ, অপরাধ ও মাদকাসক্তি। তাঁর মতে, বিত্তবান মানুষের হাতেই মাদকাসক্ত হওয়ার মতো যথেষ্ট সময় থাকে। ‘আমি সুবিধাপ্রাপ্ত… আমার নিজের একটা ঘর আছে। আমি চাইলে সেখানে শুয়ে থাকতে পারি। আমাকে আগামীকালের চিন্তা করতে হয় না—কে আমাকে খাওয়াবে, কে আমার পরিবারকে খাওয়াবে।’ তিনি মাদকের প্রভাব নিয়ে খুব চিন্তিত। তিনি বলেন, কীভাবে ইয়াবা সেবনকারীরা ‘দুই বছরও টিকতে পারে না’। কারণ, তারা ঘুমায় না। ‘এটি ধীরে ধীরে বিষপ্রয়োগ, এটি একটি নিখুঁত পরিকল্পনা।’

Posted ১২:১৬ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

কাঁঠাল সমাচার

(2328 বার পঠিত)

Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: weeklybangladesh@yahoo.com

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.